perm_phone_msgUNDER ATTACK?

Top Categories

Spotlight

Brahmins caste

today20 May, 2022

Sanaton + Others Aditta Chakraborty

ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মণ হয়, কর্মসূত্রে ব্রাহ্মণ হয় না ব্রাহ্মণ বিদ্বেষগণ

বর্ণাশ্রম (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র) জন্মগতই তার সর্ব প্রকার শাস্ত্র প্রমাণ । শ্রুতি প্রমাণ – কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় আপস্তম্ভ ধর্ম সূত্র ( ৪,৫,৬) চত্বারো বর্ণা ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্যশুদ্র: ( ৪) তেষাং পূর্ব: পূর্বী জন্মত: শ্রেয়ান্ ( ৫) অশুদ্রাণামদুষ্টকর্মণামূপায়নং বেদাধ্যয়নমগ্নয়াধেয়ং ফল বন্তি চ কর্মাণী (৬) অর্থ – বর্ণ চারটি ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য [...]


ঈশ্বরের প্রতিমা পূজা হইতে পারে কিনা? (পর্ব – ১)

Sanaton + Others Protap Chakraborty today22 April, 2022 25

Background
share close

সনাতন হিন্দু সমাজের সন্তানদিগের অবস্থা আজি বড়ই করুণ! আচার, শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রভৃতি সকল বাতিলের খাতার সদস্যতো হইয়াছেই, তাহার সহিত সনাতন দেবদেবীগণের অস্তিত্ত্বও প্রায় বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। আহা মরি! মরি! যে দেবতা এককালে হিন্দুর হৃদয়মন্দিরে অবস্থান করিতেন তাঁহাদিগের অবস্থান আজিকে হিন্দুর পদতলেও নাই! দেবতা নাম শুনিলেই হিন্দুগণ নাক কুচকাইয়া কুসংস্কার বলিয়া উড়াইয়া দিতে চাহেন! যে দেবতার প্রীতির উদ্দেশ্যে সতী নিজেকে দগ্ধ করিতে প্রস্তুত ছিল, যে দেবতার জন্য হিন্দু একসময় সর্ব্বস্ব ত্যাগ করিতে প্রস্তুত ছিল, যে দেবতা জন্য হিন্দু বিধর্মীর মস্তক ভূলুন্ঠিত করিতেও কুণ্ঠিত হয় নাই, অদ্য সেই হিন্দুদিগের দেবতা প্রতি এত বিদ্বেষ কি কারণবশতঃ? দেবতা নাম শুনিলেই কেন হারাম হারাম রব উঠিতেছে? 

বর্তমান হিন্দু সমাজের নব্য যুবক পণ্ডিতগণ এক্ষণে দেব প্রতিমা বিরুদ্ধে যবনের ন্যায় খড়্গ হস্ত হইয়াছেন। তাঁহারা যবন প্রতিরোধ করিতে পারেন না পারেন, যবন তাঁহার ভগ্নী ভাগাইয়া লইয়া গেলেও তাঁহাদের প্রতি খড়্গ হস্ত হইতে পারেন না, কিন্তু জাতপাতের দোহাই দিয়া হিন্দুদিগকে ও ব্রাহ্মণদিগকে ঠিকই গালাগাল করিয়া থাকেন। যবনের গুষ্টি উদ্ধার করিতে না পারিলেও, নীরিহ দেবমুর্ত্তিগণের প্রতি তাহাদিগের যত আক্রোশ তাহা ঠিকই মিটাইয়া থাকেন! তদুপরি তাঁহাদের সহিত হুজুগে ভক্তসকল জুটিয়া অগ্নিতে ঘি, কেরোসিন ঢালিয়া দেব বিদ্বেষের উপন্যাস রচনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে। ইহারা হিন্দু সমাজে থাকেন বলিয়া মূর্ত্তি ভাংগিতে সাহস পান না বটে কিন্তু স্বকীয় চন্দ্রবদন নিঃসৃত বাণী দ্বারা যে দেব প্রতিমার গুষ্টির ষোড়শ শ্রাদ্ধ করিতেছেন তাহা মূর্ত্তি ভাংগন অপেক্ষা কিছু কম নহে! পিতার পৃষ্ঠদেশে পদাঘাত করা যে বিষয় – তাঁহাকে জুতা দিয়া মারিব উক্ত উক্তিও ঐ পদাঘাতের সমান। যবণগণ নাহয় অসুর বংশ বলিয়া, দেবতা সহ্য করিতে পারে না, কিন্তু তোমরা নব্য পণ্ডিতগণ কাহাদের বংশ?! যেই ব্রাহ্ম সমাজ ও আর্য্য সমাজকে, তৎকালীন পণ্ডিত ব্রাহ্মণ সমাজ যুক্তি নামক সম্মার্জ্জনী দ্বারা উত্তম মধ্যম সহিত বংগ হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন, তাঁহারা কি করিয়া পুনরায় সনাতনের শ্রাদ্ধ করিতে আসিল তাহা বিশাল গবেষণার ব্যাপার। 

হিন্দু জাতি আজি বড়ই দূর্ব্বল। ধর্মের নাম করিয়া ছাঁই পাশ গিলিতে হিন্দু জাতি পূর্ব্ব হইতেই সিদ্ধহস্ত। এক্ষণেও সেই ছাঁই পাশ গিলিয়া, বিড়ি ফুঁকিয়া ভোলানাথের সিদ্ধির নিন্দা করিতেছে, কৃষ্ণ মহাশয়ের রাসলীলা লইয়া তামাশা করিতেছে, ভগবতী রাধিকারাণীকে বেশ্যা ডাকিতেছে, ব্রহ্মাকে সরস্বতীদেবীর পিছু লইবার দায়ে দাঁবড়াইয়া বেড়াইতেছে!কই?! প্রাচীনকালে হিন্দু সমাজ ইহা শুনিয়াও তো নষ্ট হয় নাই! কই! তাহারা তো ব্যাভিচারে লিপ্ত হয় নাই! যাহাদিগের মধ্যে হইবার আশঙ্কা দেখিয়াছে, তাঁহাদিগকে সমাজচ্যুত করিতে ক্ষণকাল সময় হিন্দু সমাজ তৎকালে ব্যয় করে নাই! পাশ্চাত্ত্য অনেক দেশে আপন রক্তসম্বন্ধে যৌণ ক্রিয়া প্রচলিত হইয়াছে এক্ষণে। নব্যপণ্ডিতগণ উহার দোষ কি এক্ষণে হিন্দুর পুরাণের উপর দিবেন? নানা সাহিত্য-গল্পে রোমাঞ্চকর যৌনতা সমৃদ্ধ গল্প পড়িয়াও যখন মানুষ ব্যাভিচারে লিপ্ত হয় নাই, তখন পুরাণ পড়িয়াও এমত হইবে এরূপ মূর্খের ন্যায় আশঙ্কাও অবান্তর নহে কি? ধর্ম মধ্যে কি যৌনতা পড়ে না? ধর্ম গ্রন্থে কি পাপের বয়ান থাকিতে পারে না? পূণ্য ও পাপ উভয়েই ধর্মশাস্ত্রের অঙ্গ স্বরূপ। পাপের বর্ণন তাহা প্রতিহত করিবার জন্য আর পূণ্যের বর্ণন লোকহিতকর কার্য্যে আপনাকে নিয়োজিত করিবার জন্য! ধর্মশাস্ত্রে পাপকর্মের চিত্রায়ণ না করিলে মনুষ্য কি প্রকারে তাঁহাকে পাপ বলিয়া জ্ঞাত হবে? অনেকেই উত্তর করিবে- মনুষ্যের আপন সাধারণ জ্ঞান দ্বারা। সাধারণ জ্ঞান দ্বারা ও জৈবিক বৃত্তি দ্বারা কখনো পাপপূণ্যের বিচার হইতে পারে না। পূর্ব্ব হইতে “এই কার্য্যখানি পাপ” এমত অঙ্গুলী দিয়া না দেখাইয়া দিলে তাহা পাপ এইপ্রকার ভাবের উন্মেষ হইবার সম্ভাবনা নাই। ইউরোপ আমেরিকাবাসীগণ চারিশত বৎসর পূর্বেও বন্য ও যাযাবর ছিল বলিয়া ইতিহাসে উক্ত হইয়াছে। উহাদের কাছে বনমানব হইতে বর্তমান মানুষে পরিণত হইবার তত্ত্ব স্বাভাবিক। কিন্তু হিন্দুর জন্য উক্ত কথা সত্য নহে। পাপের বয়ান ও চিত্রায়ণ ধর্মগ্রন্থতে রহিয়াছে মানবের শিক্ষা বিশেষের জন্য। বিশেষ করিয়া পুরাণ শাস্ত্র সমূহ শিক্ষা মূলক কাহিনী আবৃত গ্রন্থ। আচার সর্ব্বস্ব গ্রন্থ নহে। গৃহস্থের কাম ধর্ম কি ধর্ম নহে? উহা কি পাপ? যাহারা ব্যাভিচার নামক পাপ করিয়াছে তাহারা দেবতা হইলেও ছাড় পান নাই। বিধাতার শাসন দেবগণকেও দণ্ডের আওতায় আনয়ন করিয়াছেন। শারিরীক দণ্ড ও মানসিক দণ্ড উৎপন্ন অনুতাপ অনল দ্বারা তাঁহাদিগকে জর্জ্জরিত করিয়াছেন। বিধাতার শাসন তথা প্রকৃতির বিচার হইতে কেহই বাঁচিতে পারে না। জগতমাত্রেই মহামায়া ক্রোড়ে! মহামায়া নামক মা্তা আদর যেমন করিতে পারেন তদ্রুপ কোলে লইয়া আছাড় মারিতেও একমূহুর্ত্তু দ্বিধা করেন না। মানবও যে শাসনে কদাপিও ছাড় পাইবে না, তাহাতে আর কি সন্দেহ?!  বর্তমান সমাজের হিন্দু যুবকেরা আপন রক্তসম্বন্ধীয় ভগ্নীকে প্রেমের নাম করিয়া ভাগাইয়া নিয়া যাইতেছে ব্যাভিচারে লিপ্ত হইতেছে! কুলাংগারগণের অনেকেই পুরাণের “প” শব্দখানিও ঠিকমত শুনিয়াছে কিনা সন্দেহ রহিয়াছে। যাহা হউক- বদকে বদ বলিলে নিজের জীবন লইয়া এক্ষণে সংশয়ে পড়িতে হয়। কুলাংগার লইয়া সমালোচনা করিবার প্রবন্ধ ইহা নয়। ইহা প্রতিমা পূজার যাহারা বিরোধিতা করেন তাহাদিগের উদ্দেশ্যে রচিত। মূলত ব্রাহ্মণগণ যাহাতে দেবতা প্রতি বীতশ্রদ্ধ না হন তাঁহার উপায় করিতেই প্রবন্ধ লিখিবার উদ্যেগ- 

 প্রথমেই পূর্ব্বপক্ষের আপত্তি সমূহে আসিতে হয়- 

 ১/ নিরাকার সর্বব্যাপ্ত ঈশ্বরের আকার কল্পনা হয় কি প্রকারে? 

 ২/প্রতিমা পূজায় সর্ব্বব্যাপ্তের বিশালত্ত্বের হানি হইবার কারণে কি তাঁহার অপমান হয় না? তাঁহার রূপ ধারণে কি প্রয়োজন?

 ৩/ ভিন্ন ভিন্ন দেবমূর্ত্তির উপাসনার কি দরকার? একদেবতা পূজা করিলে কি সমস্যা? 

 ৪/সর্বোত্তম পদার্থ অবলম্বণ উপায় করিয়াই বা পূজা করিবার কি দরকার?

 ৫/ দেবপ্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইলে মৃতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিতে কি সমস্যা? 

 ৬/ ধ্যান সর্ব্বোত্তম বিষয় আবার তাহাতে প্রতীকের কি প্রয়োজন? 

 ৭/ দেবপূজার কোন ফল তো বর্তমানে দেখিতে পাইতেছি না অতএব পূজা করিয়া ফল কি? 

 ৮/ সম্প্রদায় ভেদে পূজা পদ্ধতি হইবার কি কারণ? 

 ৯/প্রতিমা পূজা বেদ বিরুদ্ধ অতএব ইহার আচরণ কি অনৈতিক নহে?

 ১০/ প্রতিমা পূজার প্রমাণ না দর্শাইলে মানিব কেন? পুরাণ তন্ত্র হইতে আমরা স্বয়ং প্রতিমা পূজা বিরোধিতার প্রমাণ দিয়াছি, তাহা পারিলে খণ্ডন কর? 

নিরাকার সর্বব্যাপ্ত ঈশ্বরের আকার কল্পনা হয় কি প্রকারে? 

অতি প্রাচীনকাল হইতে হিন্দু শাস্ত্রে দুই প্রকারের সাধন পদ্ধতি চলিয়া আসিতেছে। প্রথম প্রকার – নির্গুণ ব্রহ্ম উপলদ্ধি করিবার সাধন আর দ্বিতীয় প্রকার হইল সগুণ ব্রহ্ম উপাসনা পদ্ধতি। নির্গুণ ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য চিত্ত বৃত্তি নিরোধ পূর্ব্বক তাঁহার নাম,রূপ,ঐশ্বর্য্য,শক্তি,গুণ ইত্যাদি বিলোপ করিয়া সাধন করিতে হয়। আবার সগুণ ব্রহ্ম উপাসনায় ব্রহ্মতে উপাধি,নাম ইত্যাদি আরোপ করিয়া সেবক ভাবে শাস্ত্রীয় কর্ম দ্বারা তাঁহার সেবা করিতে হয়। বর্তমান নব্যপণ্ডিতগণ উভয় প্রকার সাধন পদ্ধতিকে গুলাইয়া জগাখিচুড়ীতে পরিণত করিয়াছেন। শাস্ত্র সর্বকাল পৃথক পৃথক পথ অবলম্বনকেই উৎসাহ দিয়াছে, কারণ কেহই জগতে এক সাথে একই সময়ে দুইটি পথে হাঁটিতে পারেনা। ইহা অবাস্তব ঘটনা। কিন্তু নব্যপণ্ডিতগণের রন্ধনকৃত এই জগাখিচুড়ী খাইয়া হিন্দু জাতির অম্বল মরণব্যাধিতে পরিণত হইয়াছে বহু আগেই। এক্ষণে ভুগিয়া মরণের পাড়ে যাইবার প্রস্তুতি বাকী রহিয়াছে মাত্র। দেবপূজা পূর্ব্বে অনুষ্ঠান সর্ব্বস্ব ছিল, এক্ষণে বিদ্রুপের বিষয়ে পরিণত হইয়াছে। হে ব্রাহ্মণগণ! অধঃপতন সবে শুরু, কলির সন্ধ্যা সমাগত মাত্র। 

নব্যদিগের ঈশ্বর আরাধনা পদ্ধতি শাস্ত্রের নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্মের আরাধনা নহে! নাম উপাধি রূপ সম্পর্কিত বন্ধনের অতীত বলিয়া তিনি নিরাকার নির্গুণ। কিন্তু যবন,খ্রীষ্টান, তৎকালীন ব্রাহ্মের আর্য্যের নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা আর ব্যাক্তি ঈশ্বরের উপাসনা আদতে একপ্রকার। আমাদের নিরাকার শাস্ত্রীয় ঈশ্বর তাঁহাদিগের উপাস্য ঈশ্বরের ন্যায় নহে। 

নব্যগণ কৃপা করিয়া, আমাকে বুঝাইয়া বলুন যে ব্রহ্ম চক্ষু, ইন্দ্রিয়, মনের, বুদ্ধির অতীত তাহা উপাসনার যোগ্য হয় কি করিয়া? চক্ষুর অতীত অতএব দেখিবার উপায় নাই, মনের অতীত মননের উপায় নাই! ইন্দ্রিয়ের অতীত অনুভবের উপায় নাই। বুদ্ধির অতীত অতএব বোধ হইবারও কোন উপায় নাই! তবে কাহার উপাসনা করিব? কাহার ধ্যান করিব? শ্রুতি ঘোষণা করিতেছে- 

 যচ্চক্ষুষান পশ্যতি যেন চক্ষুংষি পশ্যতি।
 তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিমুমাপসতে।। 
 যন্মনান মনুতে যেনামহুমনো মতম।
 তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিমমুপাসতে।। ইত্যাদি। -তথা ছান্দোগ্যে।

যাহা দেখিতেছ, অনুভব করিতেছ, ভাবিতেছ উহা ব্রহ্ম নয়, উপাসনার যোগ্য নহে- শ্রুতি ঘোষণা করিতেছে। তবে প্রশ্ন আইসে- কাহার উপাসনা করিব? কে সে?! সে যেই হউক না কেন উপাধি নাম রূপ আরোপ ব্যাতীত গত্যন্তর নাই, উপাসনার উপায় নাই। 

ওহে মূর্খ! প্রতিঘটে যে ভগবান বিরাজমান রহিয়াছে নাম, উপাধি,ঐশ্বর্য্য ইত্যাদি লইয়া, তুমি অধিষ্ঠিত সেই সকল ঘট বাদ দিয়া কাহার পূজা করিবে? 

পিতা জীবিত থাকিতে পিতার দেহস্থ আত্মার কারণে পিতাকে পূজা- সম্মান করিয়াছিলে, আত্মা দেহ ত্যাগ করিলেই তাঁহাকে শশ্মানে দগ্ধ করিয়া সেই নিঃসার দেহকে অপ্রয়োজনীয় মনে করিয়া প্রকৃতিতে লয় করিয়াছ! সেই আত্মা যতক্ষণ পিতৃনামক উপাধি, পিতৃদেহ নামক রূপ, পিতৃত্ব নামক ঐশ্বর্য্য ধারণ করিয়াছিল ততক্ষণ সেই পিতা নামক ব্যাক্তির কতইনা সম্মান ছিল! এক্ষণে আত্মাও নিখোঁজ দেহও মূল্যহীন।  কই- এক্ষণে তো পিতার আত্মার প্রত্যক্ষ পূজা করিতে সমর্থ হইতেছ না! তাঁহার মৃতদেহের প্রতিও ভক্তি দর্শাইতে পারিতেছ না। উহা অগ্নিতে ভস্মীভূত করিতেছ! পিতৃ দেহে যে ঈশ্বরের অবস্থান তাঁহাকেও আর শ্রদ্ধা দেখাইবার অবকাশ পাইতেছ না! অতএব নাম রূপ ঐশ্বর্য্য ভিন্ন সেই ঈশ্বরকে তুমি অনুধাবন করিবে কি রূপে?! ঈশ্বর পিতা নামক ঘটে বিরাজিত ছিল বলিয়াই ঘট অবলম্বণে তুমি নিজ পিতাকে সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিলেন। যৎ প্রকার চৈতন্য অধিষ্ঠাণ ভিন্ন ঘটাদি মূল্যহীন তদ্রুপ ঘটাদি বিহীন চৈতন্যের উপাসনাও নিষ্ফল। ঈশ্বর সমস্ত ঘটে প্রতিষ্ঠিত। একটি ঘট বাদ দিলেই তো তুমি সেই পূর্ণকে অপূর্ণ করিয়া ফেলিবে! প্রতি ঘটে তাঁহার প্রকাশ বিচিত্র, রূপ বিচিত্র, মহিমাও বিচিত্র। তিনি একাধারে সমস্ত ঐশ্বর্য্য প্রকাশ করেন না। সমস্ত জগত ব্যাপিয়া তিনি তাঁহার ঐশ্বর্য্য প্রকাশ করিয়া থাকেন। নাম, রূপ, ঐশ্বর্য্য মূলক জগত বাদ দিয়া তুমি কাহার পূজা করিতেছ, সেই চিন্তা কি আদৌ করিয়া দেখিয়াছ? কাঁহার পূজা করিতেছ উহা লইয়া কিয়ৎক্ষণ পরেই আলোচনা করিব। 

উপরোক্ত আলোচনা হইতে সিদ্ধ হইল যে ঘট বাদ দিয়া তাঁহার পূজা হইতে পারে না। প্রতিনিধি ছাড়া তাঁহার পূজা সম্ভব নহে! কেহ হয়তোবা বলিলেন- মনে মনে ধ্যান করিলেই তো চলে! মন কি ঘট নহে? নিরকারের কোন অবয়ব না জানিলে কি লইয়া তাঁহার ধ্যান করিবে? শূণ্য লইয়া? বহুজনে অদ্য জ্যোতির প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া ধ্যান করিতে বলেন। তাঁহাদের জ্ঞাতার্থে বলিয়া রাখি- জ্যোতি হোক কিংবা বিন্দু উহার রূপ, আলোকচ্ছটা ও সীমা রহিয়াছে। উহাও তাঁহাদিগের শাস্ত্র বর্ণিত নিরাকার নির্গুণ ঈশ্বর নহে। সগুণ ঈশ্বরেরই জ্যোতিরূপ স্বরূপ। অতএব রূপের আর হানি হইল কিরূপে? 

পাতঞ্জল ভগবান সর্ব্বিকিল্প সমাধি লইয়া বলিতেছেন- ঈশ্বর প্রণিধানাদ্ধা- সমাধিপাদ শ্লোক নং-২৩। অর্থাৎ, ঈশ্বরে শুদ্ধাভক্তি দর্শাইতে পারিলে সমপ্রজ্ঞাত সমাধি লাভ হইতে পারে। 

নিরাকার নির্গুণ ঈশ্বরকে শুদ্ধাভক্তি দর্শাইবে কি করিয়া? “ভক্তি দর্শান” তো ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা কৃত সেবাকর্ম, মন দ্বারা উৎপন্ন বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা দিয়াই দেখানো যাইতে পারে! যে বস্তু তাঁহার অতীত উহাকে কি দিয়া ভক্তি শ্রদ্ধা ভালাবাসা দেখাইবে? শাস্ত্র বলিতেছে- মন পঞ্চভূতের সূক্ষাংশ হইতে উৎপন্ন এক প্রকার জড় পদার্থ। চৈতন্য ব্যাতীত জগতে সমস্ত পদার্থ সকলই জড়। কিন্তু জড়কে ব্যপ্ত করিয়াই চৈতন্যের অধিষ্ঠান। অতএব দৃশ্যমান জড়কে অবলম্বন না করিলে অদৃশ্য সত্ত্বার খোঁজ পাইবে কি করিয়া?

আবার মন দ্বারা অসীম কল্পনা করা যায় ইহা কি কেহ বলিতে পারে? তোমার মন সর্ব্বব্যপ্ত হইলেতো, সর্ব্বঘট বিষয়ে তুমি সর্ব্বজ্ঞ হইতে। কিন্তু সর্ব্বঘট বিষয়ে যেহেতু তুমি সর্ব্বজ্ঞ নও তোমার মন নামক পদার্থও সর্ব্বঘটে বিরাজিত নহে এরূপ সিদ্ধান্তে আসিতে হয়। এক্ষণে সাকার পদার্থে নিরাকার বিষয় কল্পনা করিবার কোন সম্ভাবনা কি আর দেখিতেছ? মনে মনে অন্ধকার কিংবা শূণ্য যাহাই কল্পনা করিতে চাহ না কেন প্রতি বস্তুই তোমার মনন যোগ্য, অনুধাবন যোগ্য। যাহা মনন অনুধাবন ও দর্শনাদি ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত উহা সাকারই বটে। ধ্যান করিতে হইলেও সর্ব্বব্যাপ্ত ঈশ্বর উপর নির্দিষ্ট নামরূপ ইত্যাদি আরোপ করিয়াই ধারণা করিতে হয়। বাস্তব জগতের তুলনায় কল্পনার সীমা থাকিতে না পারে, কিন্তু কল্পনাকারী নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যেই কল্পনা বা ধ্যান করিতে সমর্থ। শূণ্য কেহ ধারণা করিতে সমর্থ নহেন, অসীম ও কেহ ধারণা করিতে সমর্থ নহে। সমর্থ নহে বিধায় গণিতবিদেরা শুণ্য ও অসীমের জন্য ০ ও ∞ উক্ত চিহ্নদ্বয় ব্যাবহার করিয়া থাকেন। এক্ষণে গণিতবিদগণকেও ভ্রান্ত ঘোষণা করিয়া বিদ্যাপাঠ চুকাইয়া দিয়া সাধু সন্ন্যাসী হও না কেন? না! তাহা করিলে অন্ন-বস্ত্রের যোগান হইবে কি প্রকারে?! চিহ্ণ বা অবলম্বণ ব্যাতীত যাহাকে ধারণাই করিতে পারনা তাঁহার আবার উপাসনার স্পর্দ্ধা প্রকাশ কর কি করিয়া? সাকার উপাসনাও বিবিধ প্রকারের। উদাহরণ স্বরূপ- জপ, তপ, ধ্যান প্রতিমাদি পূজা। ইহাদিগের মধ্যে প্রতিমাদি পূজন বাহ্য উপাসনা।

আভ্যন্তরীণ সাকারোপসনার জন্য ভগবান পাতঞ্জল উপায় বাতলাইয়াছেন- তস্য বাচক প্রণবঃ। সমাধিপাদ-২৭ নং শ্লোক। অর্থাৎ, ঈশ্বর প্রণব দ্বারা বাচ্য। প্রণবই তাঁহার নাম। অতএব তাঁহার উপাসনা করিবার উপায় কি?  ওঁ-কার নামক এই চিত্রিত অক্ষর। ওঁ-কার এই প্রতীক খানি তাঁহাকে কল্পনা করিবার উপায়। তজ্জপস্তদর্থভাবনম-সমাধিপাদ, শ্লোক নং-২৮। ওঁ-কার নামক এই প্রতীক ও তাঁহার অর্থ ধারণা করিলে ঈশ্বরের সহিত সম্প্রজ্ঞাত সমাধি লাভে সমর্থ হইতে পারিবে। পাতঞ্জল উক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়াছেন। অতএব সাধু নব্য পণ্ডিতগণ! এক্ষণে সর্বব্যাপ্ত ঈশ্বরকে সামান্য ওঁ- নামক শব্দ প্রতীকে ও ইন্দ্রিয়জাত ধ্বনিতে যে আবদ্ধ করিতেছ তাঁহাতে কি তোমার সর্ব্বব্যপ্ত ঈশ্বরের আকার কল্পনা হইতেছে না? তিনি কি সীমিত হইতেছেন না? ঐ অক্ষরের কী এমন শক্তি? মূর্তিকে ভাংগিলে সে প্রতিবাদ করিতে পারে না। বিধর্মী ওঁ-কার লিখিয়া তাঁহাকে পদদলিত করিলে সেই ওঁ-কার প্রতীকেরও কোন শক্তি নাই নিজেকে রক্ষা করিবার। অতএব প্রাণহীন শব্দে কোন ঈশ্বরকে ভজনা করিতেছ? তোমার এই প্রাণহীন অবলম্বন দ্বারা ঈশ্বর ভাবনা ভাবিবার উপায় থাকিলে, আমার জড় প্রাণহীন মূর্ত্তিতেও তদ্রুপ শক্তি রহিয়াছে। তাঁহাকে উপাসনা করিতে হইলেই প্রতীক ও অবলম্বন প্রয়োজন, তুমিও তাহা অস্বীকার করিতে পারিবে না। নির্গুণ নিরাকার ঈশ্বর তোমার সামনে প্রকট হইতে গেলে তাঁহাকে তোমার ইন্দ্রিয়াদি,মন, বুদ্ধি যে প্রকারে অনুধাবন করিতে পারিবে সেই অনুসারেই তাঁহাকে প্রকট হইতে হবে। তাঁহা দিব্য দৃষ্টি হউক আর যে দৃষ্টিই হউক না কেন জীবের ভাব অনুযায়ীই ঈশ্বর জীবকে দর্শন না দিলে তাঁহার উপর যে অনন্ত গুণ দয়াদাক্ষিণ্য, প্রেম ইত্যাদি আরোপ করিয়া থাক উহা প্রদর্শন করিবেন কিরূপে? 

সর্ব্বশক্তিমাণের জীবের ভাব অনুযায়ী প্রকট হইবার কি দরকার? প্রশ্ন করিতে পার। এই স্থূল যুক্তিসম্পন্ন প্রশ্ন যে সর্বৈব ভ্রান্ত উহা চিন্তা করিতে অধিক মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে না। জীবকে জগতবিরুদ্ধ বিষয় অনুধাবন করিতে হইলে জীবকেই জীবাতিরিক্ত অন্য কোন পদার্থে পরিণত হইতে হইবে। অতএব জীব ও জগত সৃষ্টি করিবার প্রয়োজন ঈশ্বরের বৃথা হইল বলিয়া সিদ্ধান্তে আসিতে হয়। জীবাতিরিক্ত পদার্থেই পরিণত হইতে হইলে জীব হিসেবে কর্মাদি ভোগ করিবারই কি কারণ ছিল? আবার জগতের স্বাভাবিক নীতি স্বরূপ বেদাদি প্রবর্ত্তনের প্রয়োজনই বা কি ছিল? জীব নামক ধর্মাদি, উপাধি, রূপে ইত্যাদি নানা বিষয়ে সীমাবদ্ধ হইয়াই আমাদিগকে ঈশ্বরলাভের প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান সমূহ করিতে হয়। নাহইলে জীব বিষয়ক নিয়মের অধীনে, আমাদের উৎপন্ন হইবার কোন সার্থকতা থাকে না। জীবের ঈশ্বর প্রাপ্তিই তাঁহার অসাধারণত্বের কারণ। ইহা ব্যাতীত অন্য অসাধারণ বিষয় আর কিইবা থাকিতে পারে? জীবের সংস্কার পূর্ব্বজন্ম সমস্তই যদি জগতের নিয়ম হয় তবে জগতের নিয়মে জীবকে কষ্ট প্রদান করিবার প্রয়োজন ঈশ্বরের কি কারণে হইল? প্রয়োজন থাকিলে তিনি ঈশ্বর হইলেন কিরূপে? জগত্যাদি যদি বেদাদি শব্দ হইতে প্রকাশিত হইয়া থাকে তবে বেদ বিরুদ্ধ কার্য্য ঈশ্বর করিবেন কেন? স্ব-আইন লংঘণে তাঁহার স্বাধীনতা খর্ব হইল ধরিতে হয়। বেদে সর্ব্ব আইন না থাকিলে ঈশ্বরকে নতুন আইন তৈরী করিতে হইল বলিয়াও ধারণা করিতে হয়, নতুন আইন নতুন শব্দ তাঁহার অজ্ঞাত ছিল অতএব তিনি সর্ব্বজ্ঞ নন এইমত সিদ্ধান্তও শেষপর্যন্ত দিতে হয়। আবার কল্পানুসারে একই প্রকারে সৃষ্টি করেন এই বেদবাক্যও মিথ্যা হয়, ঈশ্বরও নিজ ইচ্ছামত সৃষ্টিকারণে স্বেচ্ছাচারেরও বশ হইলেন। অতএব ঈশ্বর স্বেচ্ছাচারী ব্যাক্তিরূপে প্রতিপন্ন হইলেন। ঈশ্বর সর্ব্বদোষশূণ্য হইলে নিজের ইচ্ছার দাস হইয়া কি প্রকারে কর্ম করেন? স্বয়ং ঈশ্বরই যেখানে জগতের নিয়ম ও নীতি স্বরূপ তিনি স্বয়ং নিজেকে নিজে লংঘণ করিয়া কি প্রকারে সর্ব্বশক্তিমাণ হইবেন? তাঁহার মানে কি তিনি পূর্ব্বে সর্বশক্তিমাণ ছিলেন না? এরূপ যুক্তিবিরুদ্ধ ন্যায় বিরুদ্ধ বক্তব্য কুতর্কাদি এড়াইবার জন্য সিদ্ধান্ত করিতে হয়- ঈশ্বর আপন সৃষ্ট নিয়মেই জীবের নিকট জীবের ভাব, অধিকার, অনুভব শক্তি অনুযায়ী ব্যাক্ত হইয়া থাকেন। না হইলে সাকার জীব তদরিক্ত নিরাকার ঈশ্বর কোন ভাব লইয়া দর্শন করিবে? যাহা জীবের ঘটমধ্যে ধারণের সাধ্যই নাই জীব উহার উপাসনা কি প্রকারে করিবে? 

তোমরা সগুণ নিরাকার ঈশ্বরকে উপাস্য বলিয়া যুক্তি প্রদর্শন করিতেছ কিন্তু বলিতে হয়- তোমাদিগের উক্ত চিন্তা ভাবনায় বিস্তর গলদ রহিয়াছে। সগুণ নিরাকার ঈশ্বরে ঐশ্বর্য্য,নাম ও গুণাদি প্রয়োগ করিতে হইলে ব্যাক্তিভাব ও অভিমানের প্রয়োজন। কারণ নাম ঐশ্বর্য্য গুণ ইত্যাদি জগতের অন্তর্ভুক্ত। জগতে এমন কাহাকেও কি দেখিয়াছ কর্ত্তাভাব ভিন্ন দয়া দাক্ষিণ্য,কামনা,বীরভাব ইত্যাদি প্রদর্শন করিতে? কর্ত্তা- তথা আমি করিব এই ভাব যিনি ব্যাক্ত করিতে পারেন তিনিই তো কর্ত্তা, তিনিই ব্যাক্তিসত্ত্বা। ব্যাক্তি সত্ত্বার রূপ ও নাম না থাকিলে তোমার ঈশ্বর ঐ ঐশ্বর্য্য ও গুণ দর্শাইবেন কি করিয়া? আমি বোধ না থাকিলে ঐশ্বর্য্য গুণ ধারণের উপায় কি? উদাহরণস্বরূপ- তুমি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হইলে নিজের ভাব সঠিকভাবে দর্শাইতে পারিবে কি? কিংবা কোনকালে কি দেখিয়াছ মনুষ্য নামক ঘট ব্যাতীত মনুষত্ব ধর্মের বিকাশ ঘটিতে? ঘট ভিন্ন ভগবৎ সত্তার ঐশ্বর্য্য অনুধাবন করিতে পারিবে না। যদি নিজের অবস্থা সম্পর্কে বা কর্ত্তাভাব সম্পর্কেই তুমি জ্ঞাত না থাক তবে দয়াদাক্ষিণ্য প্রেম কি করিয়া আরেকজন কর্ত্তাভিমানসম্পন্ন ব্যাক্তিকে প্রদান করিবে? কর্তৃত্ত্ব ভাব দর্শাইতে হইলে প্রত্যেক অস্তিত্ত্বের ব্যাক্তি সত্ত্বা প্রয়োজন। অতএব সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত হইয়া তিনি বিরাট পুরুষ রূপেই নিজের ব্যাক্তিভাব ও কর্ত্তাভাব দর্শাইয়া থাকেন। তাঁহার সাথে জীবের ব্যাক্তিত্বের পার্থক্য হইল জীব সর্ব্বঘট বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ ও জ্ঞান নাই, কিন্তু ঈশ্বর সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্বশক্তিমাণ, তাঁহার সর্ব্ববিষয়ে জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে। ব্যাক্তিত্ব না থাকিলে সগুণ ও নিরাকার, ঐ “ঈশ্বর” যে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জড় পদার্থে পরিণত হয়! 

সর্ব্বব্যাপ্ত ঈশ্বরকে পূজা করিবে, প্রণাম করিবে, অতি উত্তম প্রস্তাব- কিন্তু কোথায় করিবে? পূর্ব্ব দিকে প্রণাম করিয়া বলিলে- ঈশ্বরকে প্রণাম করিলাম। তাহা হইলে প্রণাম কাঁহাকে করিলে, ঈশ্বর তো সর্ব্বব্যাপ্ত, তবে প্রণাম করিলে কি রূপে? বলিলে- পূর্ব্বদিক অবলম্বণ করিয়া ঈশ্বরকে প্রণাম করিলাম। সর্ব্বব্যাপ্ত ঈশ্বরকে প্রণাম করিতেও দিক অবলম্বণ করিতে হইল। অতএব সর্ব্বব্যপ্ত ঈশ্বরকে দিক নামক অবলম্বণ ব্যাতীত প্রণাম জানাইবার উপায়ও তোমার নাই বলিতে হয়! যদি সহস্র মস্তক ও হস্ত লইয়া প্রণাম করিতে তাহাও না হয় বুঝিতাম! ভূমিতে মস্তক ঠেকাইলে, তাহাতে ভূমি শ্রদ্ধার অবলম্বণ স্বরূপ হইল! কিন্তু জড় অবলম্বন করিয়া প্রণাম যে জানাইলে তাহাতো প্রতিমা পূজা স্বরূপই হইল! বলিতে পার ভূমিকে তুমি পরমাত্মা হিসেবে মানিয়া লও নাই ভূমিকে পরমাত্মাকে প্রণাম করিবার অবলম্বল হিসেবে বাছিয়া লইয়াছ, কিন্তু আমরাও বা কখন বলিয়াছি পাষাণ মূর্ত্তিকে আমরা পরমাত্মা মানিয়া থাকি? প্রতিমাকেও আমরা অবলম্বন রূপে বাছিয়া লইয়াছি মাত্র। অতএব আমাকে বল অবলম্বন ব্যতীত পরমেশ্বরকে ভক্তি জানাইবার কোন উপায় আছে কি? না নাই।  যেহেতু নাই তবুও প্রশ্ন করিতেই হয়- নিরাকার ঈশ্বর উপাসনা লইয়া কিসের বাহাদুরী করিতেছ? ঈশ্বর নামক সত্ত্বাকে নির্দ্দেশ করিতেও ঈ-শ্ব-র এই তিনখানি চিত্রিত রেখা কতকগুলোকে অবলম্বন করিতে হইতেছে! ঐ রেখা গুলো কি ঈশ্বরে পরিণত হইল তাই বলিয়া?

তোমার নামকরণে দোষ নাই  আর সেই ঈশ্বরের নাম ও রূপ একত্রে অবলম্বন হইলেই তোমার চুলকানি রোগ শুরু হয়! যবনের ন্যায় মূর্ত্তি ভাংগিয়া ফেলিবার জন্য লম্ফঝম্প শুরু করিয়া দাও! 

তুমি ঈশ্বরের নাম স্বরূপ প্রতিনিধি মানিতেছ আমি রূপ নামক প্রতিনিধিও তাঁহার সাথে মানিতেছি। অর্থাৎ নাম ও রূপ উভয় আরোপ করিয়া পূজা করিতেছি। নাম উচ্চারনে সকলের শ্রদ্ধা নাও আসিতে পারে। সকলে নামে বিভোর নাও হইতে পারে। অর্থাৎ শুধু নাম আরোপে সকলের কাছে তিনি বোধগম্য হইতেছে এরূপ বলা যুক্তিসঙ্গত হইতেছে না। কিন্তু দেখ সেই ভগবানকে যখন সুন্দর রূপ প্রদান করিবার প্রচেষ্টা করিতেছি তখন সেই অবলম্বনের প্রতি মানুষের কত শ্রদ্ধা কত ভালোবাসা। এই যে শ্রদ্ধাভালোবাসা ঐ মূর্ত্তির জন্য নহে মূর্ত্তিতে যে ভগবৎ সত্ত্বা ব্যাপ্ত হইয়াছে তাঁহার প্রতি। বালিকা পুতুলে চৈতন্য চিন্তা করিয়া পুতুল লইয়া ঘর সংসার করিয়া থাকে। উহা কুৎসিত ও ভ্রান্ত ধারণা বলিয়া বালিকাকে ধরিয়া চপেটাঘাত কর না কেন? তখন কেন ভাবে গদগদ হইয়া যাদুমণি, নয়নের মণি বলিয়া তাঁহাকে উৎসাহ দিয়া থাক? অস্বীকার করিতে পারিবে যে ঐ ভাব দেখিয়া তোমার মন প্রশান্তিতে পূর্ণ হয় নাই?! যদি না হইয়া থাকে তবে তুমি পশু সমান, ভাব তো দূরের কথা তোমার মধ্যে ভগবদ সত্ত্বায় সামান্যতম শ্রদ্ধা পর্যন্ত নাই! ঈশ্বর চিন্তায় শিশুর মত নির্ম্মল মন না হইলে ঈশ্বর পাইবার কোন উপায় নাই। ঐ শিশু নির্ব্বোধ হইলেও নিষ্পাপ ও নির্ম্মল।আমা-তোমাদিগের মত জড়জাগতিক চিন্তায় সে আচ্ছন্ন নহে। সে পবিত্র বলিয়াই তাঁহার কোন কিছুতে দোষ নাই। প্রতিমাতে যদি বিভোর হইয়া থাকে কোন ভক্ত তাঁহাতে সে ঈশ্বর পাইবে না এই বলিবার অধিকার তোমাকে কে দিল? সাধিয়া মোড়ল হইতে চাইলে পাদুকা দ্বারা আপ্যায়ণ ব্যাতীত আর যে গতি থাকেনা।

চিত্রিত নিষ্প্রাণ অক্ষর কে প্রতিনিধি স্যাব্যস্ত করিয়া ঈশ্বরাধানায় লিপ্ত হইতেছ, আমাদের দোষ ধর কি প্রকারে? হিন্দু কি পাষাণের মূর্ত্তি পূজা করিয়া থাকে? পাষাণের পূজাই যদি করিয়া থাকি তবে পাষাণকে দেবতা প্রতিনিধি না মানিয়া বলিতাম- হে পাষাণ তোমাকে বাটুলীর আঘাতে প্রস্তুত করিয়াছি, ছাঁচে ফেলিয়া মূর্ত্তি তৈয়ার করিয়াছি, এত কষ্ট স্বীকার করিয়া যখন তোমাকে প্রস্তুত করিয়াছি অতএব সেই কষ্টের প্রতিদান স্বরূপ আমাকে এবার রক্ষা কর। কিন্তু ভগবানকে আমরা কি বলিয়া স্তব করি? – 

গিরিজান্দ্র প্রমথপতি সর্ব্বঘট স্থিতম প্রভুম। 
প্রণমামি সদাশিবং তস্মৈ আত্মলিংগায়ৈ নমো নমঃ।।

– হে গিরিশ্বর, দেবেশ্বর! তুমি সর্ব্বঘটে বিরাজিত। হে আত্মলিংগ স্বরূপ সদাশিব আমি তোমাকে বারংবার প্রণাম করি। -এখানে কেহ পাষাণের স্তব করিয়াছে কি? পাষাণে কি সর্ব্বব্যপক সেই বিভুর বিশেষ প্রকাশকেই পরমাত্মা চিন্তা করিয়া স্তব করা হয় নাই?!

পাষাণ, ধাতু,প্রস্তর অবলম্বন মাত্র! উহাদেরকে কেন অর্চ্চণা করিব? তবে অর্চ্চণার পরেই উহাদেরকে এত আদর সম্মান প্রদর্শন করিবার আর দরকার কি? প্রশ্ন আইসে স্বাভাবিক ভাবেই। যাহা ভগবৎ প্রাপ্তি অবলম্বণ উহা অবশ্যই আদরণীয়। বেদমন্ত্র, ঈশ্বর শব্দ, ওঁ-কার তথা তৎপ্রতিনিধির স্মরণ মাত্র আমাদের মস্তক তাঁহাদের প্রতি সম্মানে অবনত হইয়া আসে। তবে ভগবৎপ্রাপ্তির উক্ত সমস্ত বিষয়ের প্রতি আমরা আদর দর্শাইব না ইহা কি প্রকারে হইতে পারে? যাহাতে তুমি শ্রদ্ধা বস্তু আরোপ করিয়াছ অবলম্বন মনে করিয়া তাঁহাতে কি প্রকারে তুমি অসম্মান দেখাইবে? নিজের পিতার মরিয়া গেলে তাঁহার শরীরও জড়বস্তু। উহাকে ধরিয়া পদাঘাত কর না কেন? আত্মার অবলম্বন স্বরূপ ছিল বলিয়া শ্রদ্ধা করিতে, এক্ষণে পদাঘাত করিতে তো আর দোষ নাই। বলিতে পার- উহা আমার পিতা! তবে ঐ প্রতিমা কি ভক্তের শ্রদ্ধার অবলম্বন নহে? ভক্তের আদরের বস্তুকে গালিগালাজ করিতে তুমি সিদ্ধহস্ত! তবে তোমার মাতা-পিতা মরিয়া গেলেও ভক্তকে গালি দিবার অধিকার প্রদান করিতে হয় বৈকি! প্রতীকে অধিষ্ঠিত পরমেশ্বর শ্রদ্ধা দেখাইতে না পারিলে সর্ব্বব্যাপক পরমেশ্বরকে কি প্রকারে শ্রদ্ধা করিবে? উহা কি ভণ্ডামী নয়? তাহলে বলিতে হয় উহার শ্রদ্ধা মেকি। পরমেশ্বরে উহার কোন প্রকার শ্রদ্ধা নাই। যে জপমালা অবলম্বণ করিয়া আমি ভগবানের নাম করি তাঁহাকেও হিন্দু কত শ্রদ্ধা করিয়া থাকে। ওহে নব্য পণ্ডিতগণ! যে মালা অবলম্বণ করিয়া গায়ত্রী জপ করিয়া থাক উহাকে মল পরিপূর্ণ গহ্বরে নিক্ষেপ করিয়া আবার ব্যাবহার কর না কেন? গুরু উপদেশ দিলে উহার পর গুরুকে গালি দিলে কি দোষ? গাভী দুগ্ধ প্রদান বন্ধ করিলে তাঁহাকে উদরসাৎ করিতেই বা কিসের দোষ? মাতা অক্ষম হইয়া পালিতে না পারিলে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাইলেই বা আর কিসের দোষ? প্রতিমা পূজা করিয়া ঊহাকে পদাঘাত যাহারা করিতে চান উহাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলা। 

আমরা জাতি মাত্রেই উৎসব প্রিয়। উৎসব আমরা পূর্ব্বেও করিতাম, এক্ষণেও করিতেছি। মহাপ্রসাদের ব্যাবস্থা করিয়া, সকলের ভোজন করাইয়া, আতশবাজী পুড়াইয়া, ঈশ্বরের নাম লইয়া আমরা পূর্ব্বে উৎসব করিতাম।  বর্তমানে পূজাতে উৎসবের নতুন উপাদান হিসাবে সুরা ও অশ্লীল নৃত্য-গীত যুক্ত হইয়াছে। ইহা দেবতা প্রতি শ্রদ্ধা না থাকার কারণেই যে উপাদান রূপে অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। বলিতে পার- দেবতাগণ স্বয়ং এই অশ্লীল কার্য্য করে তো আমাদের উক্ত কার্য্য করিতে কি সমস্যা? তোমার পিতা কোন ভুল কাজ করিলে উহার জন্য পিতাকে গালিগালাজ করা কর্তব্য নহে। পিতাকে সর্ব্বতোভাবে শ্রদ্ধা করা কর্তব্য। দেবগণের কার্য্যের অণুকরণ করাও আমাদের কর্তব্য নহে উহাদের বাক্য ও আদর্শকে ধারণ করাই আমাদিগের কর্তব্য। দেবতার ভালো কার্য্য অণুকরণ করিতে তোমাদিগের উৎসাহ নাই, উহাদিগের ভুলকেই শিক্ষা হিসেবে নিতে তোমাদিগের এত উৎসাহ কেন?! ভুল থেকে শিক্ষা লইতে পারিতেছ না ভুলকেই শিক্ষা বানাইয়া গ্রহণ করিতেছ! বলিহারি যাই পণ্ডিতের বুদ্ধির! দেবতা সকলের শুভ কর্মকে গ্রহণ কর। মানুষের সাধ্যাতীত আলৌকিক দেব কর্ম ও তাহাদিগের ভুলকে নিজের শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করিও না। তাঁহারা পাপ করিয়া পাপ কি বস্তু তাঁহার উদাহরণ দিয়াছেন। তুমি উদাহরণকে জীবনের আদর্শ বানাইলে তো তোমার বুদ্ধির সমস্যা বুঝিতে হইবে! ঋষি মুনি কি কদাপি বলিয়াছেন দেবগণের পাপকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করিতে? তাঁহারা পাপ হইতে কিভাবে বাঁচিয়া থাকিতে পারিবে তাহা লইয়াই নীতি তৈয়ার করিয়াছেন।

সর্ব্বব্যাপক ঈশ্বর ঐ দেবতা নামক ঘট হইতেই তাঁহার পূজা গ্রহণ করিয়া থাকেন। দয়ামূর্ত্তি ভগবান ঐঘট অবলম্বণেই ভক্তকে কৃপা করিয়া থাকেন। ভক্তের যা ইষ্ট সেই ইষ্টের ভাব অবলম্বণেই ভগবান ভক্তকে দর্শন প্রদান করেন। যে ভক্ত উহাকে এতাদৃশ ভক্তি সহকারে পূজা অর্চ্চণা করিতেছেন শুধু মাত্র নিরাকারবাদের দোহাই দিয়া তোমাদের অনন্ত গুণের অধীশ্বর সেই ঈশ্বর তাঁহাকে নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখান করিবেন বলিয়া কিভাবে মনে কর? ধর্ম্মমূলোহি ভগবান! ধর্মের মূলে স্বয়ং ভগবান। দয়া ক্ষমা ধৃতি ইত্যাদি ধর্মের সাধারণ দশ লক্ষণ। তবে এই ধর্মের সাধারণ দশ লক্ষণ তাহাতে যে সর্ব্বোচ্চ পরিমাণে থাকিবে ইহাতে আর কি সন্দেহ? তিনি দয়া,অস্তি,ক্ষমা, প্রেমের স্বাক্ষাৎ মূর্ত্তি। সামান্য নিরাকার ভাবের দোহাইয়ে সেই ঈশ্বর তোমার ঘৃণ্য প্রতিমাপূজাকারীকে কৃপা করিবেন না এই আস্পর্ধামূলক চিন্তা কর কি করিয়া? সেই ঈশ্বরে অধর্ম নামক পদার্থ আশ্রয় করিবে কি প্রকারে? একমাত্র জগদুদ্ধারেই ভগবান ক্রোধ,হিংসা ইত্যাদি ভাবকে আশ্রয় করিয়া অভক্তকে বিনাশ করেন। কিন্তু তাঁহাকে বিনাশ করিয়াও তাঁহার উদ্ধারের জন্য ব্যাবস্থা করিয়া দেন। কংসকে মারিয়া বৈকুন্ঠ দিয়াছেন। উহা কি ভগবানের দয়া নহে? দিবানিশি যে কংস ভগবানকে আশৈশব কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়া অত্যাচার করিয়াছেন সে ভগবান সেই পরম শত্রুকেও বধ করিয়া বৈকুন্ঠ প্রদান করিয়াছেন। তাঁহার কংস নিধন লোকশিক্ষা নিমিত্ত। দুষ্টের শাস্তি অবশ্যাম্ভাবী এই ধর্ম রক্ষার্থেই ভগবান ক্রোধের আশ্রয় করিয়াছেন। শেষমূহুর্ত্তে তবুও ভগবান তাঁহাকে মুক্তি হইতে বঞ্চিত করেন নাই।  ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদদেশেঽর্জ্জুন তিষ্ঠতি – সেই ঈশ্বর হৃদয়ে বসিয়া কি ভক্তের আকুলতা দর্শন করিতেছে না? তাঁহাকে পাইবার যে ইচ্ছা ভক্ত হইতে ব্যাক্ত হইতেছে তাঁহা কি ঈশ্বর দর্শন করিতেছেন না? তিনি  কি দেখিতেছেন না অর্থ সম্পত্তির মায়া না করিয়া যে ভক্ত তীর্থে তীর্থে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে? তিনি কি দেখিতেছেন না নাওয়া খাওয়া ছাড়িয়া শরীরের দিকে দৃকপাত না করিয়া ভক্ত যে তাঁহার জন্য উপবাসী রহিয়াছে? তবুও কি বলিতে চাও তোমার সগুণ নিরাকারী ঈশ্বর তাঁহাকে কৃপা করিবে না। বেদের উলটচণ্ডাল ভাষ্যের দোহাই দিয়া তাঁহাকে ঈশ্বর অমান্যকারী বলিতেছ কোন সাহসে?! 

বিজ্ঞানের দোহাই দিয়া নিরাকার অতীন্দ্রিয় ঈশ্বরকে প্রতিষ্ঠা করিতে চাও! বলতো তোমার বিজ্ঞান কোন কালে অতীন্দ্রিয় ঈশ্বরকে স্বীকার করিত? ইন্দ্রিয়াতীত (মেটাফিজিক্যাল এলিমেন্ট) পদার্থ এর অস্তিত্ত্ব শুনিলে মাত্রই যেখানে তোমার বিজ্ঞানে কানে তালা লাগিয়া যায়, সেখানে অতীন্দ্রিয় সর্ব্বব্যাপী মেটাফিজিক্যাল এই পদার্থ এর অস্তিত্ত্ব তুমি বিজ্ঞান দিয়া প্রমাণ করিতে উদগ্রীব। যাহার আয়তন,আকার কিছুই নাই তাঁহাকে সর্ব্বব্যাপ্ত বলিয়া কি প্রকারে প্রমান করিতে চাহ তাহা আমরা আস্তিকদিগের বুঝিবার অতীত। অর্থাৎ বিজ্ঞান তোমার কথাকে একশ বছর পর অস্বীকার করিলে তুমিও ভগবদ অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ প্রকারে অস্বীকার করিবে? বিজ্ঞানকে অপবিজ্ঞানের পরিণত করিয়া ঈশ্বর প্রতিষ্ঠাতে তোমার কত না প্রচেষ্টা! নিজের মন মত আবোল তাবোল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খাড়া করাইয়া এই বৈজ্ঞানিক ঈশ্বর নামক অপবিলাপকে সান্তনা হিসেবে আর কতদিন গ্রহণ করিবে? বিজ্ঞান ঈশ্বরকে যেদিন অস্বীকার করিবে (এক্ষণে ঈশ্বর স্বীকারই করেনা) সেদিন কি যুক্তি বলে ঈশ্বরকে প্রতিষ্ঠা করিবে? তোমার আস্তিক্যের দৌড় কতটুকু, তবে তাহা বুঝিতে পারা গেল। 

হে নব্য পণ্ডিত! সর্ব্বব্যপ্ত ঈশ্বর বলিতে তুমি কি বুঝ? এই জগত হইতে আলাদা কিছু কি? তিনিই জগতের সর্ব্বঘট ধারণ করেন বলিয়া তিনি সর্বব্যাপ্ত। এই বিরাট সগুণ ব্রহ্ম জগদমূর্ত্তি রূপে নিজেকে প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু জগদমূর্ত্তিদেহ ধারণ করিয়াও তিনি চৈতন্য রূপে জগদ হইতে অতিরিক্ত। সম্পূর্ণ বিশ্ব সমষ্টি যাঁর দেহ, তিনি কি সর্ব্বব্যপ্ত হন না? যদি বল না তিনি সর্বব্যপ্ত হইলেও বিশ্বাদি দেহ হইতে আলাদা, তবে আলাদা হইলে তিনিই আর সর্বব্যপ্ত কেমনে হইলেন? ঘৃত অন্নের উপর ছড়াইয়া দিলে অন্নকে ব্যাপ্ত করিলেও অন্নজনিত কারণে যে স্থান দখল হইয়াছে তাঁহাকে ব্যাপ্ত করিতে সমর্থ নহে। অতএব স্বয়ং বিশ্ব তাঁহার দেহ না হইলেও উক্ত প্রকারে ব্যাপ্তি সম্ভব হইতেছে না। অর্থাৎ বিশ্বকে নিজ দেহস্বরূপে নির্ম্মাণ করিয়াও তিনি বিশ্বাতিরিক্ত সর্ব্বদা নির্গুণ চৈতন্য তথা আপন স্বরূপে উদ্ভাসিত। নির্গুণ চৈতন্যরূপ ঈশ্বরকে জ্ঞাত করিবার জন্যই বিশ্বনামক দেহ ভগবতী মায়া তথা চৈতন্য নির্গতা শক্তি চৈতন্যে নির্ম্মাণ করিয়াছেন। 

ব্রহ্ম এবং জগত অভিন্ন নহে। কারণ ব্রহ্মই জগতের অধিষ্ঠান। জগত ব্রহ্ম ভিন্ন মিথ্যা হইতে পারে কিন্তু ব্রহ্ম আর জগত ভিন্ন করিবে কি প্রকারে? উহা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নহে। বহু কোটিজন্মের অভ্যাস ফলে মনুষ্যের বৈরাগ্য জন্মিয়া থাকে তথা জগত পদার্থ যে ব্রহ্ম হইতে স্বতন্ত্র হইলে মিথ্যা হয় ইহা সম্পর্কে ধারণা জন্মাইয়া থাকে। ভগবান জৈগিষব্য দশকোটি কল্প পর্যন্ত জন্মচক্র পাড় করিয়া তবে বৈরাগ্যের ভাব নমুনা ধরিতে পারেন! আর তোমরা সেদিনকার বালক ছোকড়া, ধর্ম কি তাহাই বুঝ না, উহার তাঁহার মত পাঠ করিয়াই বৈরাগ্য অবলম্বণ করিয়া বেম্ম বেম্ম বলিয়া কীর্ত্তন করিতে আরম্ভ করিয়াছ?!

ব্রহ্মসত্যং জগন্মিথ্যা অর্থাৎ ব্রহ্মপদার্থ সত্য জগত সৎ ও অসৎ উভয় এই প্রকার হইবার কারণে অনির্ব্বচনীয়, ব্রহ্ম হইতে স্বতন্ত্র হইলে অস্তিত্ব নাই অতএব মিথ্যা। জগত যেহেতু ব্রহ্মে অধিষ্ঠিত অতএব জগত স্বয়ং ব্রহ্মকে উপাসনার অবলম্বন হইতেছে। তুমি বলিতে পার নির্গুণ ব্রহ্মই সর্ব্বোচ্চ সত্য। কিন্তু নির্গুণে জগত নামক বস্তুই নাই উহার উপাসনা করিবে কি প্রকারে? আমি বলি নির্গুণ ও সগুণে উপাধি ভিন্ন অন্য কোন পার্থক্য নাই। সগুণ ঈশ্বর আপনার স্বরূপ সর্বক্ষণ বর্তমান থাকে বিধায় তিনিই আদতে নির্গুণ ব্রহ্ম। ঈশ্বর দ্বিবিধ পদার্থ নহে ব্যবহার জন্য কল্পনা করা হইয়া থাকে মাত্র। কারণ স্বরূপে নির্গুণ ঈশ্বর হইতে জগত হইতে পারেনা। কারণ যাহা নির্গুণ তাঁহাতে কারণ বলিয়া কোন ঘটক থাকিতে পা্রে এই চিন্তাও অমূলক। সময় ,চলক, রূপান্তর আবর্ত্তন ইত্যাদি ঘটকই যখন মহামায়ার অধীন তুমি মায়োপধিক রহিত ঈশ্বরকে কি করিয়া জগতের কারণ বলিয়া নির্দ্দেশ করিবে? অতএব সগুণ ঈশ্বর বা নির্গুণ ব্রহ্মই উপাদান রূপে জগত্যাদির কারণ স্বরূপ ধরিতে হয়। যথা শ্রুতি- সদেব সৌম্যদমগ্রমাসীৎ ইত্যাদি। বালু হইতে তৈল নির্গত হইতে কেহ দেখিয়াছে কি? নিরাকার হইতে সাকার তদ্রুপ হইতে পারে না। মায়াশক্তি দ্বারা ব্রহ্ম সগুণ না হইলে জগতমূর্ত্তিধারণ করিবেন এই কথা শ্রুতি স্বীকার করে না। শুধু যে জগতকে তাঁহার মূর্ত্তি বলিয়া যে বেদ কীর্তন করিতেছে তাহা নহে! বরং তাঁহার অন্যান্য বিশেষ রূপের বর্ণনও বেদ করিতেছে। যথা- যাতে রুদ্রশিবাতনুর ঘোরা পাপকাশিনী! নির্গুণ জগত অসম্বন্ধীয় ঈশ্বরকে মানা না মানা সমান ব্যাপার। যাঁহার সাথে জগতের সম্পর্ক নাই যিনি জগতের কর্ত্তাই নহে ঢাকঢোল বাজাইয়া তাঁহাকে পূজা করিবার বা ঘি নষ্ট করিয়া যজ্ঞ করিবার কোন প্রয়োজন পড়িতেছে না। যেহেতু জগত বিষয় ঈশ্বর শূণ্য অতএব জগদস্থ জীবও ঈশ্বর শূণ্য অতএব কর্ত্তা মানিবার প্রয়োজন তাঁহাদের নাই। তাহারা আপন আপন কর্ত্তা বলিয়া নিজেই নিজেদের মুক্তি বিধান করিতে স্বক্ষম। জগতের সহিত তাঁহার সম্পর্ক না থাকিলে তিনি সর্ব্বব্যপকও হইতে পারেন না। অতএব যেপ্রকারেই চিন্তা কর না কেন জগৎসম্বন্ধীয় সগুণ ব্যাক্তিসত্ত্বাকে কর্ত্তা বলিয়া আমরা মানিতে বাধ্য। নির্গুণ ব্রহ্মের জগত বলিয়া কিছু নাই তিনি উপাসনার যোগ্যও নহে দয়াদাক্ষিণ্য প্রেম ইত্যাদি সেই পরম চৈতন্য হইতে কেহ আশা করিতে পারে না। উহাই জ্ঞাতা উহাই জ্ঞেয়! বহু জন্ম কাটাইয়া বৈরাগ্য আসিলে তবেই সেই পরম পদার্থ সম্পর্কে মানবের ঔৎসুক্য আসিতে পারে, কিন্তু কাহাকে কি দেখিয়াছ জগতকে অস্বীকার পূর্ব্বক তাঁহার সাধনে নামিতে? ব্যাতিক্রম দিয়া আপনাদিগকে বিচার করিও না। তোমাদিগের বৈরাগ্য বহু দূরে রহিয়াছে, কিন্তু নিরাকারের দোহাই দিয়া অপরের সংযম নষ্ট করিতে ব্যাস্ত হইয়াছ। অতএব সাধারণের জন্য জগদরূপী ঈশ্বর রহিয়াছেন, তিনি কৃপা করিলে জন্ম জন্মান্তর চক্র হইতে মুক্তি পাইয়া এই সাধারণ এককালে অসাধারণ হইয়া উঠিতে পারিবেন। কিন্তু উহা সময় স্বাপেক্ষ, গুটিপোকাকে আপন খোলস হইতে নিজেই সময় হইলে তাহা কাটিয়া বাহির হইয়া যায়। ইহার আগে বাহির হইতে গেলে গুটিপোকার মরণ ব্যাতীত গত্যন্তর নাই। 

 

গীতায় ভগবান বলিয়াছেন- পশ্য মে পদার্থ রূপাণি। অহং বিবস্বতে যোগম! মামেকং শরণং ব্রজ! তবে কৃষ্ণকে অবলম্বণ ব্যাতীত অর্জ্জুন কি প্রকারে আশ্রয় করিবেন? অর্জ্জুনের সম্মুখে তিনি যে নারায়ণ ও বিশ্বরূপাদি মূর্ত্তি প্রকাশ করিয়াছেন তাঁহাকে আশ্রয় করিয়া অর্জ্জুন তাঁহার আশ্রয় গ্রহন করিবেন। তাহাও না হইলে কৃষ্ণ মূর্ত্তিতে শ্রদ্ধা প্রকাশ করিবেন। যে পরমাত্মা কৃষ্ণদেহতে বিরাজমান তাঁহা জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় উভয়, শরণ বা উপাসনা করিবার বস্তু নহে!

ঈশ্বর নিরাকার ও সাকার উভয়ে কি প্রকারে হইতে পারে? ঈশ্বরের ইহা অবিচ্ছিন্ন ভাব। সূর্য্যরশ্মি যেমন সপ্তরশ্মি দ্বারা শ্বেতোজ্জ্বল আলোক গঠন করিয়া থাকে নিরাকার ও সাকার উভয়েই যুগপৎভাবে ঈশ্বরে অবস্থান করিয়া থাকে। ঈশ্বরে অসম্ভব সম্ভব হইয়া থাকে। এক্ষণে বলিতে পার উহা কি জগদনিয়মের বহির্ভুত নহে? প্রশ্নেই তুমি গলদ করিয়াছ! এক্ষণে জগতের ব্যাপার নহে ঈশ্বরের সাকার নিরাকার ভাব লইয়া কথা হইতেছে। স্বয়ং ঈশ্বরে অসম্ভব ঘটিতে পারে উহা অবাস্তব নহে। কিন্তু ঈশ্বর ও জগৎসম্বন্ধীয় ব্যাপারে জগত্যাদি নিয়ম যেহেতু ঈশ্বর স্বয়ং অতএব উহাতে এইধরণের বিরোধ সম্ভব নহে। আর জীবের সাকার শরীর সাকার মনাদি বুদ্ধি ভিন্ন নিরাকার নির্গুণ ঈশ্বরের ধারণা উৎপন্ন হইতে পারে না উহা আগেই বলিয়াছি। কারণ ঐ ধারণা লৌকিক নহে। উক্ত কারণেই বেদ-বেদান্ত আলৌকিক শাস্ত্র। মনুষ্য ও জগত নিয়মাতীত নির্গুণ ব্রহ্মের তত্ত্ব প্রদান করে বলিয়াই বেদ আলৌকিক। উক্ত ধরণের ব্রহ্ম পদার্থ সাকার জগতের অধীন নয় বলিয়া আমরা উহা বেদ হইতে জানিয়া থাকি। ঈশ্বর নামক ধারণা করিবার জন্যই জগতবুদ্ধি ঈশ্বরে আরোপ করিতে হইবে। মৃত্তিকা হইতে ঘট- উক্ত প্রক্রিয়ায় যেমন মৃত্তিকাতে ঘটত্ব নামক আকার ও নাম আরোপ করিতে হয় তেমনি, ঈশ্বর নামক পদার্থ রহিয়াছে এই অস্তিবুদ্ধি আনিতে গেলেও জগত নামক বস্তু উহাতে আরোপ করিয়া নির্দেশ করিতে হয়। কারণ জগতে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় উহার কর্ত্তা কে? এই চিন্তায় মনুষ্য মধ্যে ঈশ্বর ধারণার কারণ। জগত দেখিয়াই তাঁহার সৃষ্টি এইরূপ ধারণা করিতে পার। জগত না দেখিলে তুমিই বা কোত্থেকে আসিলে, ধারণার কথা নাহয় বাদই করিলাম।

এক নব্যপণ্ডিতকে দেখিলাম কিছুদিন আগে বলিতেছেন জ্ঞান দ্বারা ঈশ্বর পূজা করিব। তাঁহার জ্ঞান কি ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ নহে? নাহইলে জ্ঞানকে অবলম্বণ করিয়া কি প্রকারে পূজা করিবে? উক্ত জ্ঞান কি জিনিস উহা জিজ্ঞেস করিলে তিনি যে নিরুত্তর হইবেন তাঁহা আমিও বিলক্ষণ জানিয়া আর প্রশ্ন করিতে উদ্যত হইলাম না। জ্ঞান আর জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে তাঁহার সম্যক ধারণা যে নাই তাঁহা বুঝিয়া নিশ্চুপ হইলাম।

ঈশ্বর নামক পদার্থের ধারণাই হইয়া থাকে সাকার জগত দ্বারা। ঈশ্বরের কল্পনাও হইয়া থাকে মন নামক সাকার পদার্থ দ্বারা। এতদসত্ত্বেও এই সমস্ত নব্যপণ্ডিতগণ নিরাকার ঈশ্বর নিরাকার ঈশ্বর বলিয়া কেন আস্ফালন করেন উহা আমার বোধগম্য নহে। তাঁহারা ব্রহ্মবিদ আমরা ভ্রান্ত জড়োপাসক মাত্র। উত্তম! অতি উত্তম! -ঘট দেখিয়া কুম্ভকারের কল্পনা যেমতে করা হইয়া থাকে যেমনঃ ভালো ঘট হইলে কুম্ভকার ভালো মন্দ ঘট হইলে কুম্ভকারের অভিজ্ঞতা নাই ইত্যাদি তেমনি সাকার জগত দেখিয়াই সেই পরমেশ্বরের কল্পনা হইয়া থাকে। কিন্তু বস্তুতঃ ঘট বা জগত হইতে আহরিত জ্ঞান নির্ভুল নহে। উক্ত আহরিত জ্ঞান আমরা কল্পনাকৃত ঈশ্বরে আরোপ করিয়াছি মাত্র। অর্থাৎ এক্ষণেও ধারণা দ্বারা আমরা সাকার ঈশ্বরই প্রতিপাদন করিতেছি। বস্তুত উক্ত নির্ম্মাতা কি পদার্থ তাহা আমাদের কল্পনাতীত। নির্গুণ ব্রহ্মও তদ্রুপ পদার্থ। এক্ষণে কি প্রমাণ হয় না যে- উহার সাকারোবলম্বন ব্যাতীত উপাসনা সিদ্ধ হইতেছে না?

সর্ব্বব্যপ্ত নিরাকার ব্রহ্মের পূজার অবলম্বন অখিল ব্রহ্মাণ্ড হইলেও তাঁহাতে নির্গুণ ব্রহ্ম নহে সগুণ সাকার ব্রহ্মের ধারণাই পরিপোক্ত হইয়া থাকে। আকার অবয়ব গুণ ভিন্ন ঈশ্বর অনুভব করিবে কি প্রকারে? বিশাল বিশাল করিয়া যে এত বকিতেছ- জগত বিশাল বলিয়াই তো ঈশ্বরে বিশালত্ব ভাব আরোপ করিতেছ। যে বিশাল ভাব জগতের অন্তর্গত তাঁহা ঈশ্বরে আরোপ করিয়া তাঁহাকে কি তখন সাকার করিয়া তুলিতেছ না? সাকার জগতের গুণ ঐশ্বর্য্য নাম রূপ ইত্যাদি আরোপ করিয়াই যখন তুমি তাঁহাকে অনুভব করিতেছ তখন তিনি সগুণ সাকার ব্রহ্ম না হইয়া পাড় পাইবেন কিভাবে? সূর্য্য দেখিয়া বলিতেছ – ঈশ্বরের জ্যোতি ইহার মত কিংবা ইহা অপেক্ষাও ঊজ্জ্বল। নদীর স্রোত দেখিয়া বলিতেছ ইহা ঈশ্বরের প্রেমের ধারা। ফসলী মাঠ দেখিয়া বলিতেছ ইহা ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্য। জগতের গুণ আকারাদি সংজ্ঞা দিয়াই যেখানে ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করিতেছ তখন ঈশ্বরকে নিরাকার বানাইতে চাহ কোন দুঃখে? প্রতিমা পূজা পৌত্তলিকতা হইলে জগত নামক আকার গুণ বিশিষ্ট ঈশ্বরকে মনন চিন্তনও পৌত্তলিকতা। উহা কি অস্বীকার করিতে পার? 

সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে অবলম্বণ না করিয়া ঈশ্বরের বিশেষ বিশেষ প্রকাশ ও ঐশ্বর্য্যকে প্রতিমা দ্বারা নির্দেশ করিয়া পূজা করে সনাতনীগণ। কারণ মানুষের উপাসনার অবলম্বন যত স্পষ্ট যত প্রকাশমান উহাতে আকর্ষণও তত বেশি। নারী সত্ত্বাতে মাতৃমূর্ত্তি দেখিলে উহাতে বিশ্বজননী জগন্মাতাকে কি দেখা হয়না? বলিতে পার- তবে আর মূর্ত্তি পূজায় কাজ কি? মনুষ্যের সেবা করিলেও তো কাজ হয়। দেখ জগতে সকলের শ্রদ্ধা এক পদার্থে হইতে হইবে এমন কোন নিয়ম নাই। মনুষ্য মধ্যে স্বভাবে বৈচিত্র্য, কর্মে বৈচিত্র্য, কর্তব্যে বৈচিত্র্য, উদ্দেশ্যে বৈচিত্র্য। নানা বৈচিত্র্যের সমাবেশে মানব। পূর্ব্বজন্মের সংস্কারাদি সমস্তেও বৈচিত্র্য। অতএব তাঁহার শ্রদ্ধার বস্তু মধ্যেও যে বৈচিত্র্য থাকিবে ইহাতে আর সন্দেহ কি? আবার দেখ মনুষ্যের সেবা করিতে হলেও তাঁহাকে সম্পূর্ণ পরমাত্ম রূপে সেবা করাও সম্ভব নহে। কারণ মাতাতে মাতৃভাব পিতাতে পিতৃভাব ইত্যাদি নানা মনুষ্যের নানা ভাব অনুযায়ী তাঁহার সাথে আচরণ করিতে হয়। স্ত্রীর সহিত মাতা প্রতি কৃত আচরণ দর্শান কি সম্ভব? না। অতএব ভাব প্রকাশের সীমাবদ্ধতা হেতু সমস্ত ভাব সমর্পণ করিবার অবস্থাও সৃষ্টি হয় না। সর্বতোভাবে সমর্পণ না হইলে ঈশ্বর প্রাপ্তি হইবে কি করিয়া? কিন্তু ঈশ্বর প্রতিমাতে সাধকের আপন ভাব ভিন্ন অন্য কোন ভাবের অধিষ্ঠান হয় না। সুতরাং সর্বভাব শ্রদ্ধা তাহাতে উজার করিয়া দিতে কোন প্রকার সমস্যা নাই। আর প্রতিমাতে যেরূপ ঈশ্বরের অধিষ্ঠান তদ্রুপ মনুষ্যেও ভগবৎ সত্ত্বার অধিষ্ঠান ইহা জানিয়াই পূজক সাধনা করিবে। শাস্ত্র তবুও মাতার পূজা, কুমারীর পূজা, রাজার পূজা ,গুরুর পূজা পিতার পূজা ব্রাহ্মণের পূজা, পশুপাখি, গ্রন্থ, দোয়াত, কলম ইত্যাদি সমস্ত কিছুরই পূজা করিবার উপদেশ দিয়াছে। তাহা হইলে শাস্ত্রকে দোষিবে কিরূপে? “শাস্ত্র কোন ঘট বাদ রাখিয়াছে” এরূপ অভিযোগ আর করিতে পার না। কিন্তু তাহাতে বিশেষ অনুষ্ঠানের কি প্রয়োজন? দেখ- অনুষ্ঠান বিশেষ মূহুর্ত না আসিলে মন মধ্যে তদ্রুপ শ্রদ্ধার জাগরণ ঘটে না। ছাগ দেখিয়াই কেহ পূজা করিবে কিংবা প্রণাম করিবে ইহা মনে করা বোকামী। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য সময় , ক্ষেত্র, পাত্র বিচার করিতে হয়। নিজ মধ্যে প্রস্তুতির ভাব না আসিলে পূজা করা সম্ভব হইবে কিরূপে?  

সমস্ত জড়তে ঈশ্বর অধিষ্ঠান জানিয়াই ঋষি, আচার্য্য গণ শিবলিংগ দেখিয়াই স্তব করিতেন- নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে। নিবেদয়ামি চ আত্মানং ত্বং গতি পরমেশ্বর!। এক্ষণে বল- ঋষিগণকি সামান্য প্রস্তরকেই পূজা করিতেছিলেন নাকি প্রস্তরে অধিষ্ঠিত সেই পরমেশ্বরের রূপকে বন্দনা করিতেছিলেন? তাঁহারা কি মূর্খ না গর্দভ ছিলেন?! যে ঈশ্বরকে বর্ণনা করিতে বেদ পর্যন্ত তথমত খাইয়াছে এখন তোমাদিগের কথা শুনিয়া ঈশ্বরতত্ত্ব ডালভাত বলিয়া বুঝিতে হইবে?! সর্ব্বব্যপ্ত ঈশ্বর যে রূপ,নাম,ঐশ্বর্য্য আদির অন্তর্গত হইয়াই উপাসনার যোগ্য তাঁহা আস্তিক মাত্রেই বুঝে।

 চলিবে………………

Written by: Protap Chakraborty

Rate it
Previous post
সত্যকাম জাবাল এর জন্ম মীমাংসা

today22 April, 2022

  • 11
close

Sanaton Protap Chakraborty

সত্যকাম জাবাল এর জন্ম মীমাংসা

ঘোরতর কলি সমাগত! নিশার ব্যাপ্তিকালে দিনমণি নিষ্প্রভ প্রায়। যেন ঘোর তমিস্রার সূচনা! তমিস্রাই কলি, অজ্ঞানতাই কলি! জীব- বিবেকের নিদ্রাকালই কলি। বিধাতার রচনা অদ্ভুত, কালের গতিও অলংঘণীয়- কালের দোর্দ্দণ্ড প্রতাপ রোধ ...